সময় এখন অর্গানিক কৃষির

অর্গানিক কৃষি: এন্টিবায়োটিক থেকে নিরাপদ খাদ্যের পথে

লেখক: কৃষিবিদ মো. শাহীন আলমপ্রেক্ষাপট

সময় এখন অর্গানিক কৃষির। ১৯৮০ সালের দিকে প্রাণিজ উৎপাদন (মাংস, ডিম, দুধ) বাড়াতে ব্যাপকভাবে শুরু হয় এন্টিবায়োটিক/গ্রোথ-প্রমোটার ব্যবহার। কিন্তু প্রায় এক দশক পর থেকেই এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ১৯৯৪ সালের দিকে বিভিন্ন গবেষণার আলোকে এন্টিবায়োটিকের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রকাশ্যে আসে এবং বিশ্বব্যাপী বিষয়টি বড় আলোচনায় পরিণত হয়।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের বড় ঝুঁকির কথা উঠে আসে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে গ্রোথ-প্রমোটার হিসেবে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ হয়।
এর ফলে একদিকে যেমন নিরাপদ খাদ্যের পথে অগ্রগতি হয়, অন্যদিকে প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও দেখা দেয়। তখন বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ বিকল্প খুঁজতে গবেষণা শুরু করে—কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাংস, ডিম ও দুধের উৎপাদন ধরে রাখা ও বাড়ানো যায়


বিকল্প ভাবনা: হার্ব-ভিত্তিক অর্গানিক পদ্ধতি

বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পায় অর্গানিক পদ্ধতি—বিশেষ করে গুল্ম/হার্বজাতীয় ওষুধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ ব্যবহার করে প্রাণিজ উৎপাদন বাড়ানোর গবেষণা। অর্থাৎ এন্টিবায়োটিকের বদলে এমন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের পথ খোঁজা হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে উৎপাদনও টিকিয়ে রাখতে পারে।


বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীর অবদান: ড. আল মামুন

অর্গানিক কৃষির এই আন্তর্জাতিক যাত্রায় বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীরাও যুক্ত হন। তাদের মধ্যে অন্যতম ড. আল মামুন
তিনি ২০০৩–০৪ সালের দিকে এশিয়ান ইয়ুথ ফেলোশিপে জাপানের মনোবুকাগাকুসো মন্ত্রণালয়ের আওতায় অর্গানিক সিস্টেমে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন ধরে রাখা ও বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। জাপানের ইউয়াতে ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. হিরোআকি সানোর শুরু করা অসমাপ্ত কাজ ড. মামুন সম্পন্ন করেন।


স্বীকৃতি

অর্গানিক কৃষিতে লাগসই ও কার্যকর কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে—

  • ২০০৮ সালে জাপানের গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড,

  • ২০০৯ সালে জাপানিজ সোসাইটি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স কর্তৃক আউটস্ট্যান্ডিং ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড
    পান ড. মামুন।


বাংলাদেশে কী দরকার

ড. মামুন মনে করেন, বিশ্ব এখন অর্গানিক খাদ্যে বিশ্বাসী। অনেক উন্নত দেশে “খাদ্য নিরাপত্তা” অর্জনের পর তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে নিরাপদ খাদ্য
বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তার দ্বারপ্রান্তে থাকলেও নিরাপদ/অর্গানিক খাদ্য উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ কম। স্বাস্থ্যসম্মত ও মেধাবী জাতি গঠনে এখনই অর্গানিক কৃষিকে এগিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সময়—এ জন্য দরকার:

  • সুষ্ঠু পরিকল্পনা

  • নির্ভরযোগ্য গবেষণা

  • সহযোগিতা

  • দক্ষ জনবল


অর্গানিক খাদ্যের উপকারিতা

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্স–এ উল্লেখ আছে, অর্গানিক ফুড—

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক

  • কোষের ক্ষতি কমিয়ে ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে

  • সুস্থ-সবল শিশু জন্মগ্রহণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে

  • কাজের ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক

  • প্রাণিজ আমিষের সংরক্ষণকাল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে

  • খাদ্যের রং, গন্ধ, স্বাদ উন্নত করতে পারে

  • স্ট্রোক ও হার্ট ডিজিজ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে


করণীয়

ড. মামুনের মতে অর্গানিক কৃষি এগিয়ে নিতে প্রথম কাজ হলো গবেষণার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এরপর প্রয়োজন—

  • গবাদিপশু ও মাছের খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে সম্পৃক্ত করা

  • প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা

  • সরকারিভাবে কার্যকর গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করা এবং প্রযুক্তি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া


এন্টিবায়োটিকের বিকল্প কী?

ড. মামুন বলেন, বাংলাদেশেই এমন অনেক হার্বজাতীয় উদ্ভিদ আছে যা এন্টিবায়োটিকের বিকল্প হতে পারে। যেমন—
সজিনা, নিম, পেঁয়াজ, রসুন (গার্লিক), প্লান্টেইন, অর্জুন, বাসক, কালমেঘ, তুলসি, পাথরকুটি, হোয়াইট ক্লোভার, রেড ক্লোভার ইত্যাদি।
তবে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে কোনটি কতটুকু, কীভাবে ব্যবহার করতে হবে—এই “লাগসই প্রযুক্তি” এখনো পর্যাপ্তভাবে উদ্ভাবিত হয়নি। এজন্য দরকার—

  • আধুনিক ল্যাবরেটরি

  • উন্নত যন্ত্রপাতি

  • দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ জনবল


ড. আল মামুনের বর্তমান কাজ

ড. আল মামুন বর্তমানে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের পশুপুষ্টি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
বাকৃবির একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১১ সালের জুলাই থেকে “ওষুধি গুণসম্পন্ন হার্ব দিয়ে ভেড়ার ওপর অর্গানিক পদ্ধতিতে গবেষণা” শুরু করেন, যা ২০১৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এত অল্প সময়ে গবেষণা সম্পূর্ণ শেষ হবে না—এ কথা জানিয়ে তিনি পরবর্তী গবেষণার জন্য সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি ২০০৩–২০১০ সময়কালে মালয়েশিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। মানিকগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই তরুণ গবেষক বলেন, বহির্বিশ্ব থেকে অর্জিত অর্গানিক কৃষির জ্ঞান দেশের স্বার্থে ব্যবহার করতে চান এবং সুস্থ-মেধাবী জাতি গঠনে অর্গানিক কৃষিকে গুরুত্ব দিতেই হবে।

লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।