বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে সার ও বীজ ছিটানোর কাজটি এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাচীন হাতে ছিটানো পদ্ধতিতে করা হয়। কিন্তু সময় বদলেছে—এখন শ্রমিক সংকট, খরচ বৃদ্ধি, উৎপাদন বাড়ানোর চাপ—সব মিলিয়ে সার–বীজ ছিটানোর কাজটিকে যান্ত্রিক ও দক্ষভাবে করার প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
হাতে ছিটিয়ে সার বা বীজ সমভাবে জমিতে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। অভিজ্ঞ কৃষকও পুরো জমিতে শতভাগ সমতা বজায় রাখতে পারেন না। ফলে ঘটে—
বীজের অপচয় (কোথাও বেশি পড়ে, কোথাও কম)
গাছ জন্মায় ঘন–পাতলা → ফলনে পার্থক্য
সার পড়ে অসমভাবে → কোথাও গাছ বেশি সার পায়, কোথাও কম
উৎপাদনশীলতা ও জমির স্বাস্থ্য দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হয়
কাজটি কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ
এই বাস্তব সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (BAU) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর ড. এ টি এম জিয়াউদ্দিন উদ্ভাবন করেছেন একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর যন্ত্র—
✅ “বাকৃবিজিয়া সার–বীজ ছিটানোর যন্ত্র”
কেন এই যন্ত্রটি গুরুত্বপূর্ণ?
যেখানে হাতে ছিটানোর সুষমতা সাধারণত মাত্র ৪০–৫০%, সেখানে মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে—
যন্ত্রটি ৮৮% থেকে ৯৮% পর্যন্ত সুষমভাবে সার–বীজ ছিটাতে পারে
রোটরের স্বাভাবিক ঘূর্ণনে (প্রায় ৭০০ RPM)
মিহি ইউরিয়া, টিএসপি, গম, ধান, মসুর, কলাই—ইত্যাদি
৯৬%–৯৭% এরও বেশি সমতায় ছিটানো সম্ভব
অর্থাৎ—একই জমিতে বীজ/সার কম লাগবে, গাছ জন্মাবে সমান, আর ফলন হবে আরও স্থির ও বেশি।
যন্ত্রটির গঠন ও কাজ করার পদ্ধতি (সহজ ভাষায়)
যন্ত্রটি মোটামুটি ৬ কেজি ওজনের এবং একজন কৃষক সহজে পিঠে বহন করে ব্যবহার করতে পারেন। এটি তৈরি করা হয়েছে—
লোহার পাতের তৈরি ফ্রেম
সার/বীজ রাখার ধারক (হপার)
মিটারিং ইউনিট (পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা)
প্লাস্টিকের গোলাকার প্ল্যাটফর্ম
ঘূর্ণায়মান লোহার দণ্ড/বিটার
হাতল + চেইন + স্প্রকেট (ম্যানুয়াল শক্তিতে চালানোর ব্যবস্থা)
কাজটা কীভাবে হয়?
ধারক থেকে বীজ/সার পরিমাণমতো মিটারিং ইউনিট দিয়ে নামে
তা পড়ে একটি গোলাকার প্লাস্টিক প্ল্যাটফর্মের উপর
প্ল্যাটফর্মে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণায়মান লোহার দণ্ড/বিটার আঘাত করে
ফলে সার/বীজ অত্যন্ত সমভাবে প্রায় ৬ মিটার চওড়া এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে
কৃষক হাঁটতে হাঁটতে হাতল ঘোরান—চেইন–স্প্রকেটের মাধ্যমে বিটার ঘোরে
কী কী বীজ ও সার ছিটানো যায়?
এই যন্ত্রে নানা ধরনের বীজ ও সার ব্যবহার করা যায়, যেমন—
✅ বীজ:
গম
ধান
ডালবীজ (মসুর, কলাই ইত্যাদি)
সরিষা
ভুট্টা
✅ সার:
ইউরিয়া
টিএসপি
এমপি (MOP)
এমনকি জমিতে সার–বীজ ছিটানো ছাড়াও—
✅ মাছচাষে পুকুরে সার বা পিলেট ছিটাতেও ব্যবহার করা যায়
কাজের গতি: হাতে বনাম যন্ত্র
এখানেই সবচেয়ে বড় সুবিধা!
হাতে ছিটানো: ঘণ্টায় ≈ ০.৩০ হেক্টর
বাকৃবিজিয়া যন্ত্রে: ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ≈ ২.০ হেক্টর
মানে—একই সময়ে প্রায় ৬–৭ গুণ বেশি জমিতে কাজ করা সম্ভব।
সুবিধাগুলো এক নজরে
✅ সার–বীজ ছিটানো হয় সুষমভাবে (৮৮–৯৮%)
✅ বীজ ও সারের অপচয় কমে → খরচ কমে
✅ সমান চারা/গাছ জন্মায় → ফলন বাড়ে
✅ সময় ও শ্রম অনেক কম লাগে
✅ বিদ্যুৎ বা জ্বালানি লাগে না
✅ হাতে রাসায়নিক সার স্পর্শ করতে হয় না → স্বাস্থ্যঝুঁকি কম
✅ যন্ত্রের দাম তুলনামূলক কম, রক্ষণাবেক্ষণ সহজ
✅ ইউনিয়ন/থানা পর্যায়ে তৈরি ও বিক্রি করা সম্ভব → স্থানীয় কর্মসংস্থান
কীভাবে ব্যবহার করবেন (Step-by-step)
যন্ত্রের মিটারিং ইউনিটের কাঁটা শূন্য অবস্থানে রাখুন (ধারক বন্ধ থাকবে)
ধারকে প্রয়োজনমতো বীজ/সার ভরুন
যন্ত্রটি কাঁধে নিয়ে বেল্ট দুটো বুকের উপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে নিন
মিটারিং কাঁটা উপযুক্ত সেটিংয়ে দিন (ফসল/সারের পরিমাণ অনুযায়ী)
জমির এক পাশ দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটুন (প্রায় ৪ কিমি/ঘণ্টা)
হাঁটার সাথে সাথে হাতল স্বাভাবিকভাবে ঘোরান
কাজ শেষে যন্ত্র পরিষ্কার করুন
ঘূর্ণায়মান অংশে অল্প তেল/মোবিল দিন এবং শুকনা স্থানে রাখুন
দাম ও কোথায় পাওয়া যায়?
যন্ত্রটির আনুমানিক মূল্য: প্রায় ৩,৫০০ টাকা
দেশের অনেক অঞ্চলে এটি পাওয়া যায়
বিস্তারিত তথ্যের জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর জেলা অফিস
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BAU), কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগ
শেষ কথা
বীজ আর সার—দুটোই এখন দামী। তাই “যতটা সম্ভব অপচয় কমিয়ে” সমভাবে প্রয়োগ করা মানেই লাভ।
বাকৃবিজিয়া সার–বীজ ছিটানোর যন্ত্র কৃষকের সময় বাঁচায়, খরচ কমায়, আর ফলন বাড়াতে সহায়তা করে—সবচেয়ে বড় কথা, এটি চালাতে বিদ্যুৎ–ডিজেল কিছুই লাগে না।
বাংলাদেশের কৃষিকে আধুনিক করতে ছোট ছোট এই ধরনের যন্ত্রই হতে পারে বড় পরিবর্তনের শুরু।










0 comments:
মন্তব্য করুন