মাশরুম: পরিচিতি, পুষ্টিগুণ ও বাংলাদেশে সম্ভাবনা
মাশরুম হলো একটি অসবুজ সবজি—অর্থাৎ ব্যাসিডিওমাইসিটিস (Basidiomycetes) বা অ্যাসকোমাইসিটিস (Ascomycetes) শ্রেণীর ছত্রাকের খাবার উপযোগী ফলনধারী অঙ্গ (Fruiting body)। বাংলাদেশে এটি এখনও তুলনামূলকভাবে নতুন ও অপ্রচলিত হলেও প্রকৃতপক্ষে মাশরুম একটি অতি প্রাচীন খাদ্য। পবিত্র কুরআন শরিফের সূরা আল-বাকারার ৫৭নং আয়াতে উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ খাবার হিসেবে “মান্না”-র কথা উল্লেখ আছে—অনেকে মনে করেন, এই মান্না মাশরুমই ছিল। একইভাবে ঋকবেদে উল্লিখিত “সোমরস”, যা দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো—তা ছিল মাশরুমের নির্যাস। প্রাচীন গ্রিস, রোম ও চীনেও মাশরুম ব্যবহারের বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মাশরুম একটি সমাদৃত ও জনপ্রিয় খাবার।
১) মাশরুমের পুষ্টিগুণ
মাশরুম অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি খাবার। এতে আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন (প্রায় ৩০%) এবং এই প্রোটিনে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সবগুলো অ্যামাইনো এসিড থাকে। ফলে এটি অনেক দিক থেকে প্রাণিজ প্রোটিনের মতো “সম্পূর্ণ প্রোটিন” হিসেবে বিবেচিত। তবে প্রাণিজ প্রোটিনের মতো এতে কোলেস্টেরল নেই এবং ফ্যাটও কম। তাই মাশরুমের প্রোটিনকে অনেকেই নির্দোষ ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন হিসেবে দেখেন—যা সব বয়সের মানুষ এবং বিভিন্ন রোগীর জন্যও উপযোগী খাবার হতে পারে।
মাশরুমে বিভিন্ন ভিটামিনও থাকে—যেমন ভিটামিন, নায়াসিন, ফলিক এসিড ইত্যাদি। নির্দিষ্ট গবেষণা অনুযায়ী ভিটামিন ই২, নায়াসিন ও ফলিক এসিডের মাত্রা যথাক্রমে ১.৮–৫.১, ৩১–৬৫ এবং ০.৩০–০.৬৪ মি.গ্রাম/১০০ গ্রাম হতে পারে।
মাশরুম মিনারেলসেরও ভালো উৎস। শুকনো ভিত্তিতে এতে পটাশিয়াম, ফসফরাস, জিংক ও কপারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য (Dutta, ২০০৭)। এসব পুষ্টি উপাদান মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
২) পরিবেশ ও মাশরুম
মাশরুম চাষের বড় সুবিধা হলো—এতে সাধারণত কীটনাশক, রোগনাশক এমনকি রাসায়নিক সারেরও প্রয়োজন হয় না। চাষের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয় বিভিন্ন ফেলনা কৃষিজ ও বনজ বর্জ্য—যেমন ধানের খড়, গমের খড়, আখের ছোবড়া, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি। এগুলো অনেক সময় যত্রতত্র পড়ে থেকে পরিবেশ দূষণ করে। কিন্তু এসব বর্জ্য ব্যবহার করেই পাওয়া যায় সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও অনেক ক্ষেত্রে ওষুধিগুণসম্পন্ন খাবার—মাশরুম। তাই মাশরুম চাষকে পরিবেশবান্ধব কাজ বলা যায়।
৩) বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও মাশরুম চাষের উপযোগিতা
বাংলাদেশ ২০°৩৪′ থেকে ২৬°৩৮′ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত। ঋতুভেদে এদেশে তাপমাত্রা সাধারণত ১৩° থেকে ৩৮° সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠানামা করে—যা অনেক ধরনের মাশরুম চাষের জন্য উপযোগী।
বিশ্বের অনেক দেশে “সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত” (Total Control) পরিবেশে মাশরুম চাষ করা হয়, যা ব্যয়বহুল। কিন্তু বাংলাদেশে “আংশিক নিয়ন্ত্রিত” (Semi-control) পরিবেশে তুলনামূলক কম খরচে সারা বছর বিভিন্ন জাতের মাশরুম উৎপাদন সম্ভব—ফলে উৎপাদন ব্যয় কমে আসে এবং লাভের সম্ভাবনাও বাড়ে।
৪) কাঁচামালের সহজপ্রাপ্যতা ও মাশরুমের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে মাশরুম উৎপাদনের কাঁচামাল সহজেই পাওয়া যায়—ধানের খড়, গমের খড়, কাঠের গুঁড়া, আখের ছোবড়া, ফেলনা কাগজ, বিভিন্ন ঘাস ইত্যাদি। শুধু ধান ও গমের খড়ের কথাই ধরলে দেখা যায়—দেশে বছরে কমপক্ষে প্রায় ৩.০ কোটি মেট্রিক টন ধান ও গমের খড় উৎপন্ন হয়। এর এক দশমাংশও যদি মাশরুম চাষে ব্যবহার করা যায়, তাহলে বিপুল পরিমাণ মাশরুম উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাশাপাশি আখের ছোবড়া, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি ব্যবহার করেও বড় পরিসরে উৎপাদন সম্ভব।
৫) জনসম্পদ, কর্মসংস্থান ও মাশরুম
বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি—প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৯৫৩ জন (২০০৭)। এই বিপুল জনসংখ্যাকে উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত করার বড় সুযোগ হলো মাশরুম চাষ, কারণ এটি শ্রমঘন (Labour intensive) কাজ। অল্প জায়গায় বহু লোকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব।
দেশে প্রায় ২.৫ কোটি পরিবারের বাড়ির আশপাশে কিছু না কিছু খালি জায়গা পড়ে থাকে—যেখানে সূর্যালোক কম বা জমি চাষের উপযোগী নয়। সেসব জায়গায় অনায়াসে মাশরুম চাষ করা যায়।
মহিলাদের কর্মসংস্থান
মাশরুম চাষ নারীদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। গৃহবধূ থেকে শুরু করে চাকরিজীবীসহ সব বয়সী নারী পারিবারিক কাজ শেষ করে, সন্তান লালন-পালন করে, পর্দা রক্ষা করেও ঘরে বসেই মাশরুম চাষ করতে পারেন এবং সংসারে বাড়তি আয় যোগ করতে পারেন।
৬) শিল্প হিসেবে মাশরুম
মাশরুম সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও বহুমুখী খাবার হওয়ায় বিশ্বজুড়েই এর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে যদি মাশরুম শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে এটি এমন একটি শিল্প হতে পারে যার কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন নেই—সব উপকরণ দেশেই পাওয়া যায়। অথচ বিশ্ববাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা বিশাল। কারণ অনেক দেশে উৎপাদন ব্যয় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি—এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ মাশরুম রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।
৭) মাশরুম চাষের বিশেষ সুবিধা
উর্বর জমির প্রয়োজন নেই—বসতঘরের পাশে, গাছের নিচে, ছায়াযুক্ত স্থানে চাষ করা যায়।
তাকে-তাকে বহুস্তরে চাষ করা যায়—একই জায়গা বহুগুণে ব্যবহার সম্ভব, যা অন্য ফসলে নেই।
দ্রুত উৎপাদনশীল—স্পন প্যাকেট কেটে দেওয়ার পর প্রায় ৬–৭ দিনেই ফসল আসতে শুরু করে, ফলে পুঁজি দ্রুত ফেরত আসে।
ঝুঁকিমুক্ত—ঘরের ভেতর চাষ হওয়ায় বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি কম।
৮) মাশরুম উপজাতের বিকল্প ব্যবহার
মাশরুম উৎপাদনের পরে যে “স্পেন্ট সাবস্ট্রেট” (Spent substrate) থাকে, তা কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন—
স্পেন্ট সাবস্ট্রেট দিয়ে উন্নতমানের কম্পোস্ট তৈরি করা যায়।
ধানের খড় মাশরুম উৎপাদনে ব্যবহার হলেও তা গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্য থাকে; অনেক ক্ষেত্রে মান আরও ভালো হয়।
মাশরুম চাষের পর অবশিষ্ট খড় গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে দিলে প্রাণীর স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে পারে।
পরবর্তীতে গবাদিপশুর মলমূত্র দিয়ে কম্পোস্ট, বিশেষ করে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে কৃষি জমিতে ব্যবহার করা যায়।
যোগাযোগ ও পরামর্শ
মাশরুম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও পরামর্শের জন্য জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র, সাভার, ঢাকা অথবা দেশের বিভিন্ন সাব-সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হলো।










0 comments:
মন্তব্য করুন