ছাদে বাগানের একটি প্রয়োজনীয় সার ভার্মি কম্পোষ্ট

ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরির নিয়ম (ছাদবাগানের জন্য) + কীভাবে ব্যবহার করবেন 

ছাদে বাগানে ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর জৈব সার হলো ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার)। এটি মাটির স্বাস্থ্য ভালো করে, উর্বরতা বাড়ায়, গাছকে সবল করে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহার অর্ধেকেরও কম করা যায়। ভার্মি কম্পোস্টে জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, ম্যাগনেশিয়াম, বোরণসহ বিভিন্ন উপকারী উপাদান থাকে। এছাড়া এতে কিছু এনজাইম ও হরমোনজাতীয় উপাদান থাকায় গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে।

নিচে ছাদবাগানের জন্য ঘরে/ছাদে সহজে ভার্মি কম্পোস্ট বানানোর নিয়ম এবং সঠিকভাবে ব্যবহারের পদ্ধতি একসাথে দিলাম।


১) ভার্মি কম্পোস্ট বানাতে যা লাগবে

ক) পাত্র/বেড

আপনি যেটা সহজে পান সেটাই ব্যবহার করতে পারেন—

  • প্লাস্টিকের ড্রাম/বালতি

  • ফোম বক্স

  • কাঠের বাক্স

  • ইট-সিমেন্টের ছোট বেড

  • বড় টব (কম্পোস্ট বেড হিসেবে)

সাইজ আইডিয়া (ছাদবাগানের জন্য):
২ ফুট × ১.৫ ফুট × ১ ফুট (ছোট বেড) / অথবা ৫০–১০০ লিটারের ড্রাম

খ) উপকরণ

  • আধা-পচা গোবর (সবচেয়ে ভালো)

  • শুকনা পাতা/খড়/কাগজ কুচি (কার্বনের উৎস)

  • রান্নাঘরের সবজি-ফলের খোসা (অল্প অল্প করে)

  • সামান্য বালি/ঝুরঝুরে মাটি (পাতলা স্তর)

  • পানি স্প্রে করার বোতল

  • ঢাকনা/বস্তা/জুট কাপড় (ঢেকে রাখতে)

গ) কেঁচো

ভার্মি কম্পোস্টের জন্য সাধারণত রেড উইগলার/আইজেনিয়া ফেটিডা টাইপ কেঁচো ভালো কাজ করে (স্থানীয়ভাবে যে ভার্মি কেঁচো মেলে সেটাও চলবে)।


২) বেড/পাত্র তৈরি ও সাজানোর ধাপ

ধাপ–১: পাত্রে ড্রেনেজ/বাতাসের ব্যবস্থা

ড্রাম/বালতি হলে নিচে ও পাশে কিছু ছিদ্র করুন যেন

  • অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায়

  • বাতাস চলাচল করে

ছিদ্র দিয়ে কেঁচো বের হওয়া ঠেকাতে নিচে নারিকেলের ছোবড়া/জালি/কাপড় বিছিয়ে দিতে পারেন।

ধাপ–২: নিচের স্তর (বেডিং)

প্রথমে ২–৩ ইঞ্চি করে দিন—

  • শুকনা পাতা/খড়/কাগজ কুচি

  • সামান্য ঝুরঝুরে মাটি

  • অল্প পানি স্প্রে (ভিজে ভিজে থাকবে, পানি চুপচুপ করবে না)

ধাপ–৩: খাবার/কম্পোস্ট স্তর

এরপর দিন—

  • আধা-পচা গোবর (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)

  • সঙ্গে অল্প শুকনা পাতা/খড় মিশিয়ে দিন
    টিপস: গোবর যদি একদম টাটকা হয়, আগে ৭–১০ দিন আলাদা রেখে “গরম ভাব” কমান। টাটকা গোবর গরম হয়ে কেঁচো মারতে পারে।

ধাপ–৪: কেঁচো ছাড়া

উপরের স্তর একটু ঠান্ডা/স্বাভাবিক হলে কেঁচো ছাড়ুন।
তারপর উপরে আবার পাতলা করে শুকনা পাতা/বস্তা/জুট কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন।


৩) যত্ন ও পরিচর্যা (যেটা মানলেই সফল)

আর্দ্রতা

  • আর্দ্রতা থাকবে ৫০–৬০%

  • হাত দিয়ে চাপ দিলে ভেজা লাগবে, কিন্তু পানি গড়াবে না

  • শুকিয়ে গেলে স্প্রে করুন

তাপমাত্রা

  • ২০–৩০° সেলসিয়াস সবচেয়ে ভালো

  • খুব গরম হলে ছায়া দিন, সরাসরি রোদ লাগতে দেবেন না

খাবার দেওয়ার নিয়ম

  • সপ্তাহে ১–২ বার অল্প করে দিন

  • রান্নাঘরের বর্জ্য দিলে ছোট ছোট করে কুচি করে দিন

  • বেশি টক/ঝাল/তেলযুক্ত খাবার দেবেন না

  • পেঁয়াজ-রসুন/লেবুর খোসা বেশি দিলে গন্ধ/অম্লতা বাড়তে পারে—কম দিন

যেগুলো দেবেন না

  • প্লাস্টিক, কাঁচ, ধাতু

  • বেশি নোনতা/তেল-চর্বিযুক্ত খাবার

  • কেমিক্যাল/ডিটারজেন্ট লাগা জিনিস


৪) কত দিনে সার তৈরি হবে এবং বুঝবেন কীভাবে?

সাধারণত ৪৫–৬০ দিনের মধ্যে ভালো ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি হয় (আবহাওয়া ও ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে)।

চেনার লক্ষণ

  • রং গাঢ় বাদামি/কালচে

  • মাটি মতো ঝুরঝুরে

  • তীব্র দুর্গন্ধ থাকবে না (হালকা মাটির গন্ধ)

  • বড় বড় গোবর/খাবারের টুকরা থাকবে না


৫) সার সংগ্রহের সহজ পদ্ধতি (কেঁচো আলাদা করবেন যেভাবে)

পদ্ধতি–১: আলো পদ্ধতি

কম্পোস্ট ঢিবি করে রাখুন। আলোতে কেঁচো নিচে চলে যাবে। উপর থেকে সার তুলে নিন।

পদ্ধতি–২: এক পাশে খাবার দিন

পাত্রের এক পাশে নতুন খাবার দিন। কেঁচো ওই দিকে চলে গেলে অন্য পাশের সার তুলে নিন।


৬) ছাদবাগানে ভার্মি কম্পোস্ট কীভাবে ব্যবহার করবেন

আপনার লেখাটা আরও গুছিয়ে, ব্যবহার অংশটা একদম “ফর্মুলা” করে দিলাম—

টবে গাছ লাগানোর আগে (মাটি প্রস্তুতি)

২০ ইঞ্চি টবের জন্য:
✅ অন্যান্য মাটির মিশ্রণের সাথে ৪০০ গ্রাম ভার্মি কম্পোস্ট ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
তারপর ১৫ দিন পর চারা লাগালে সেটলিং ভালো হয়।

গাছ লাগানোর ৪–৫ মাস পর থেকে (মেইন টপ ড্রেসিং)

প্রতি গাছে ২০০ গ্রাম ভার্মি কম্পোস্ট
২ মাস অন্তর অন্তর
✅ গাছের গোড়ার মাটি হালকা খুঁচিয়ে সার দিন, তারপর সামান্য পানি দিন।

ছোট টব/ছোট গাছের জন্য সহজ হিসাব

  • ১০–১২ ইঞ্চি টব: ১০০–১৫০ গ্রাম

  • ১৪–১৬ ইঞ্চি টব: ১৫০–২০০ গ্রাম

  • ২০ ইঞ্চি টব: ২০০–২৫০ গ্রাম (রুটিনে), প্রস্তুতিতে ৪০০ গ্রাম


৭) কিছু কমন সমস্যা ও সমাধান

১) দুর্গন্ধ হচ্ছে
➡️ পানির পরিমাণ বেশি / খাবার বেশি / বাতাস কম
✅ শুকনা পাতা দিন, নাড়াচাড়া করুন, ছিদ্র/বাতাস বাড়ান

২) পোকা/মাছি হচ্ছে
➡️ খাবার ওপরে খোলা আছে
✅ খাবার সবসময় ভেতরে চাপা দিন, উপর থেকে শুকনা পাতা/কাপড় ঢাকুন

৩) কেঁচো ওপরে উঠে যাচ্ছে
➡️ খুব গরম/অম্লতা/পানি জমে গেছে
✅ ছায়া দিন, পানি কমান, টক খাবার কমান