বিকাশ কীর্ত্তনিয়া, বাকৃবি (আপডেটেড ও বিস্তারিত রূপ)
কেন এই প্রযুক্তি দরকার?
আউশ, আমন ও বোরো—সব মৌসুমেই ধানচাষে সেচ লাগে। তবে বোরো মৌসুমে বৃষ্টি প্রায় থাকে না, তাই সেচের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে—
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে
ডিজেলের দাম বেড়েছে
বিদ্যুৎ লোডশেডিং/অনিয়মিত সরবরাহ আছে
ফলে সেচ এখন ধানচাষের বড় সংকট।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, কাদা করে রোপণ না করে “শুকনো জমিতে বপন” (Dry/Direct Seeding) করলে বোরো ধানে ৫০–৬০% পর্যন্ত সেচ সাশ্রয় সম্ভব এবং হেক্টরপ্রতি উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে—তবু ফলন ভালো থাকে।
প্রযুক্তির মূল ধারণা
প্রচলিত বোরোতে আমরা সাধারণত—
✅ জমি কাদা করে → চারা তুলে → রোপণ করি → দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখি।
এই নতুন পদ্ধতিতে—
✅ কাদা তৈরি না করে জোঁ/আর্দ্র অবস্থায় জমি তৈরি করা হয়
✅ শুকনো জমিতেই বীজ বপন করা হয় (লাইন/গর্তে)
✅ জমিতে সব সময় পানি দাঁড় করিয়ে না রেখে প্রয়োজনমতো সেচ দেওয়া হয়
➡️ ফলে পানি কম লাগে, কাজ দ্রুত হয়, খরচ কমে।
কোন জমিতে এই পদ্ধতি বেশি উপযোগী?
✅ সমতল জমি (লেভেলিং ভালো হলে পানি কম লাগে)
✅ মধ্যম দোআঁশ/এঁটেল দোআঁশ (খুব বালুমাটি হলে বারবার সেচ লাগতে পারে)
✅ যেখানে সেচ-সংকট বা ডিজেল খরচ বেশি
✅ যেখানে আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব (এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ)
ধাপে ধাপে “শুকনো পদ্ধতিতে” বোরো চাষ
ধাপ–১: জমি প্রস্তুতি (কাদা নয়, ঝুরঝুরে/সমতল)
আমন কাটার পর জমি জোঁ অবস্থায় (অতিরিক্ত শুকনো না) ২–৩ বার চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে ও সমতল করুন।
কাদা তৈরি করার দরকার নেই।
জমির চারপাশে আইল/বাঁধ ভালো করুন—পানি ধরে রাখতে ও সেচ নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে।
সম্ভব হলে জমি একদম সমান (লেভেল) করুন—এটাই সেচ সাশ্রয়ের “সিক্রেট”।
ধাপ–২: বীজ প্রস্তুতি (মুখফাটা/প্রি-জার্মিনেশন)
বীজ ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন
এরপর পানি ঝরিয়ে ৩০ ঘণ্টা জাগ দিয়ে “মুখফাটা” অবস্থা করুন
➡️ এতে বীজ দ্রুত গজায়, জমিতে সমতা আসে।
টিপস: বীজ পরিষ্কার, রোগমুক্ত ও ভালো উৎসের হলে ফলন ও গাছের স্বাস্থ্য ভালো হয়।
ধাপ–৩: বীজ বপন (লাইন/গর্তে—শুকনো জমিতে)
সারি থেকে সারি: ২৫ সেমি
গর্ত থেকে গর্ত: ১৫ সেমি
বপনের গভীরতা: ৪–৫ সেমি
প্রতি গর্তে বীজ: ৫–৬টি
এভাবে শুকনো জমিতেই বপন করতে হবে।
বপনের পরে জমি একদম শুকিয়ে গেলে হালকা সেচ দিয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখতে হবে—কিন্তু শুরুতেই জমি ডুবিয়ে দেওয়া লাগবে না।
ধাপ–৪: সার ব্যবস্থাপনা (প্রচলিত মাত্রাই যথেষ্ট)
এ পদ্ধতিতে সাধারণভাবে প্রচলিত বোরোর মতোই সার লাগে।
গোবর/কম্পোস্ট, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক → জমি তৈরির সময় মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।
ইউরিয়া ৪ কিস্তিতে দিন:
বপনের ২০ দিন পর
৪০ দিন পর
৬০ দিন পর
৮০ দিন পর
টিপস: ইউরিয়া দেওয়ার পর মাটিতে আর্দ্রতা থাকলে (বা হালকা সেচের আগে/পরে) কার্যকারিতা ভালো হয়।
ধাপ–৫: আগাছা নিয়ন্ত্রণ (এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ)
শুকনো জমিতে বপন করলে আগাছা তুলনামূলক বেশি হয়—তাই আগেই প্ল্যান দরকার।
১) প্রথম ৩ দিনের মধ্যে (প্রি-ইমার্জেন্স)
বপনের ৩ দিনের মধ্যে উপযুক্ত আগাছানাশক ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়—যেমন:
পেন্ডিমিথালিন
প্রিটিলাক্লোর
পাইরাজোসালফিউরান ইথাইল
(যেটা আপনার জমি ও আগাছার ধরন অনুযায়ী উপযোগী)
⚠️ খুব জরুরি সতর্কতা: আগাছানাশক ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই
কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন
বোতলের লেবেল নির্দেশনা মেনে চলুন
সঠিক সময়/সঠিক জমির আর্দ্রতা নিশ্চিত করুন
না হলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২) পরে নিড়ানি/যান্ত্রিক দমন
এরপর সাধারণত ১–২ বার নিড়ানি (হাত/উইডার) দিলেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
ধাপ–৬: সেচ ব্যবস্থাপনা (এটাই মূল লাভের জায়গা)
প্রচলিত বোরোতে জমিভেদে ১৮–৪০ বার সেচ লাগে।
এই পদ্ধতিতে সাধারণত ৬–১২ বার সেচ যথেষ্ট হতে পারে—কারণ জমি সারাক্ষণ ডুবিয়ে রাখা হয় না।
সেচের সাধারণ ধারণা
শুরুতে: বীজ গজানো ও চারার প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত আর্দ্রতা বজায় রাখা (প্রয়োজনে হালকা সেচ)
পরে: জমি একেবারে ফেটে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে প্রয়োজনমতো সেচ
থোড় আসার সময় (Panicle initiation/বুটিং সময়) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
৮–১০ দিন জমিতে ২–৪ সেমি পানি ধরে রাখলে ফলন ভালো হয়।
মনে রাখবেন: “কম সেচ” মানে “সেচ বন্ধ” নয়—বরং সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সেচ।
ফলন, লাভ ও বাস্তব সুবিধা
✅ সেচ ৫০–৬০% পর্যন্ত কমে
✅ ডিজেল/বিদ্যুৎ খরচ কমে
✅ শ্রম ও সময় কম লাগে (চারা তোলা/রোপণ দরকার নেই)
✅ একই সাথে ফলন ভালো রাখা সম্ভব (ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে)
সীমাবদ্ধতা ও করণীয় (বাস্তব কথা)
১) আগাছা নিয়ন্ত্রণ না করলে ক্ষতি হবে
➡️ তাই আগাছা দমন প্ল্যান আগে ঠিক করতে হবে।
২) জমি সমতল না হলে সেচ সাশ্রয় কম হবে
➡️ জমি যত সমান হবে, তত পানি কম লাগবে।
৩) অতিরিক্ত শুকনো হলে গজানো সমস্যা
➡️ বপনের পর প্রথম দিকে আর্দ্রতা বজায় রাখা জরুরি।
মাঠে নামার আগে “চেকলিস্ট”
জমি সমতল/আইল ঠিক আছে
বীজ ভিজানো–জাগ দেওয়া ঠিকমতো হবেলাইন/গর্তে সঠিক দূরত্ব বজায় থাকবে
আগাছানাশক/নিড়ানি প্ল্যান আছে
ইউরিয়া ৪ কিস্তির তারিখ লিখে রাখা
থোড় আসার সময় পানি ধরে রাখার প্রস্তুতি










0 comments:
মন্তব্য করুন