পুকুরে রুই-কাতলার পাশাপাশি গলদা চিংড়ি

পুকুর নির্বাচন ও মৌলিক শর্ত

  • পানির উৎস সহজলভ্য হতে হবে—যেমন নদী/খাল-বিল/ঝরনা/গভীর বা অগভীর নলকূপ—কারণ চিংড়ির জন্য অধিক অক্সিজেন দরকার, মাঝে মাঝে পানি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।

  • এটেল মাটি ও দোঁআশ মাটি পুকুরের জন্য ভালো; পাড়/বাঁধ শক্ত থাকে এবং পানি চুঁইয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম।

  • পুরাতন পুকুর হলে আবর্জনা, ময়লা, কচুরিপানা, কলমী লতা, হেলেঞ্চা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে।

  • পুকুরপাড় আগাছামুক্ত ও খোলামেলা হলে সূর্যের আলো ও বাতাস চলাচল ঠিক থাকে—প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরিতে এটা দরকার।

  • গলদা চিংড়ির জন্য পুকুরের গভীরতা ১–১.৫ মিটার (৩–৪ ফুট) রাখা উত্তম।

  • পুকুরপাড় এমনভাবে উঁচু করতে হবে যেন বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পুকুরে না আসে। বৃষ্টির পানি ঢুকলে পানি ঘোলা হয়, আলো কম ঢোকে, ফলে প্রাকৃতিক খাবারও কম তৈরি হয়।

  • সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ পুকুরেও চাষ করা যায়, তবে ব্যবস্থাপনা সুবিধার জন্য আয়তকার পুকুর ভালো।


পুকুর প্রস্তুতি (ধাপে ধাপে)

ক) পুকুর শুকানো / রাক্ষুসে মাছ দমন

চাষের শুরুতেই পুকুর প্রস্তুত করতে হবে।

  • সম্ভব হলে পুকুর শুকিয়ে ফেলুন। এতে রাক্ষুসে মাছ মারা যায় এবং তলদেশে জমে থাকা ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়ে যায়।

  • পুকুর শুকানো না গেলে: প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৩ গ্রাম হারে রোটেনন পাউডার পানিতে গুলে পুরো পুকুরে ছিটিয়ে দিন।

    • আগে পানি কমালে রোটেননের পরিমাণও কম লাগবে।

খ) চুন প্রয়োগ

মাটির ধরন অনুযায়ী চুনের পরিমাণ কম-বেশি হয়। নতুন/অম্লীয় মাটির পুকুরে চুন বেশি লাগে।

  • সাধারণভাবে শতাংশপ্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিন।

গ) সার প্রয়োগ (চুন দেওয়ার ৬–৭ দিন পরে)

শতাংশপ্রতি দিতে হবে—

  • পচানো গোবর: ৫–৭ কেজি অথবা

  • মুরগির বিষ্ঠা: ৩–৪ কেজি
    এবং সাথে—

  • ইউরিয়া: ১০০–১৫০ গ্রাম

  • টিএসপি: ৫০–৭৫ গ্রাম

  • এমপি: ২০ গ্রাম

টিপস: সার দেওয়ার পর অল্প পানি দিলে সার দ্রুত পচে ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়ে যায় এবং খাদ্য তৈরির উপাদানগুলো সক্রিয় হয়। এরপর পানির গভীরতা বাড়িয়ে ১–১.৫ মিটার করুন।

ঘ) পোনা মজুদ (সার দেওয়ার ৭–৮ দিন পরে)

পোনা ছাড়ার হার নির্ভর করে পানির গুণাগুণ, উর্বরতা, খাবার ও ব্যবস্থাপনার ওপর।

  • এককভাবে গলদা চিংড়ি: সাধারণত একরপ্রতি ৭,০০০–১০,০০০টি পোনা

  • পরিবেশ ঠিক রাখতে শতাংশে ৫টি সিলভার কার্প + ৫টি কাতলা পোনা দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।


সম্পূরক খাবার (ফিড)

পুকুরে সার/কম্পোস্ট থেকে তৈরি প্রাকৃতিক খাবার চিংড়ি খায়, কিন্তু ভালো বৃদ্ধির জন্য সুষম সম্পূরক খাবার প্রয়োজন। খাবার তৈরি করা যায়—

  1. চালের কুঁড়া/গমের ভুসি

  2. খৈল (সরিষা/সয়াবিন/তিল/তিষি)

  3. ফিশ মিল

  4. শামুক-ঝিনুকের খোলসের গুঁড়া

  5. লবণ

  6. ভিটামিন মিশ্রণ

খাবার দেওয়ার নিয়ম

  • দিনে ২ বার (সূর্যোদয়ের পর ও সূর্যাস্তের আগে)

  • চিংড়ির মোট ওজনের ৩%–৫% হারে খাবার দিলেই যথেষ্ট।


সার ব্যবহার (চাষ চলাকালীন)

সম্পূরক খাবারের পাশাপাশি নিয়ম মেনে সার দেওয়া দরকার (রুই জাতীয় মাছের মতো নিয়মে)।
একরপ্রতি বছরে মোট আনুমানিক—

  • ইউরিয়া: ১০০–১৫০ কেজি

  • টিএসপি: ৫০–৭০ কেজি

  • গোবর: ৩,০০০–৪,০০০ কেজি

👉 এগুলো মাসিক ভাগ করে দুই সপ্তাহ পরপর কিস্তিতে দিতে হবে।
শীতকালে সার দেওয়ার দরকার নেই।
⚠️ অতিরিক্ত প্লাঙ্কটন হলে সার ও খাবার কিছুদিন বন্ধ রাখতে হবে।


আশ্রয় ব্যবস্থা (খোলস বদলের সময় নিরাপত্তা)

চিংড়ি খোলস পাল্টানোর সময় দুর্বল থাকে—আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পুকুরে কিছু

  • পাতাবিহীন ডালপালা,

  • বাঁশ পুঁতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন—চিংড়ি লুকাতে পারবে।


চিংড়ি ধরা ও বাজারজাতকরণ

  • সাধারণত ৬–৭ মাসে চিংড়ি বাজারজাতের উপযুক্ত হয়।

  • যখন ১৫–২০টি চিংড়িতে ১ কেজি ওজন হয়, তখন বিক্রি করা যায়।

  • বড় ফাঁসের জাল দিয়ে শুধু বড় চিংড়ি ধরুন। ছোটগুলো রেখে দিন।

  • পরে ছোটগুলোও বড় হলে বা চাষ শেষ হলে পুকুর শুকিয়ে সব চিংড়ি তুলে বাজারজাত করুন।