থাই পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি নার্সিং (জুভেনাইল/পীচ তৈরি)

বর্তমানে আমাদের দেশে হিমায়িত চিংড়ি একটি বড় রপ্তানিযোগ্য পণ্য। দক্ষিণাঞ্চলে (বিশেষ করে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা) চিংড়িকে অনেকেই “সাদা সোনা” বলে থাকেন। চাষের এলাকা বাড়লেও আমাদের উৎপাদন হার পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় কম—এর অন্যতম কারণ হলো নার্সিং না করে সরাসরি পি.এল. (PL/Post-larvae) ঘেরে অবমুক্ত করা

সরাসরি পি.এল. ছাড়লে—

  • মৃত্যুহার বেড়ে যায়

  • রোগবালাই বাড়ে

  • বৃদ্ধি তুলনামূলক কম হয়

এখন অনেক চাষি সরাসরি পি.এল. না ছেড়ে দেড়–দুই মাস বয়সী নার্সিংকৃত জুভেনাইল/পীচ সংগ্রহ করে ঘেরে ছাড়ছেন। কারণ নার্সিংকৃত পীচ দ্রুত বড় হয় এবং মৃত্যুহার অনেক কম—ফলে লাভও বেশি।

কিন্তু নার্সিংকৃত পীচ সব জায়গায় সহজলভ্য নয়, আবার অনেকের নার্সিং পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণাও নেই—ফলে বাধ্য হয়ে পি.এল. ছাড়তে হয়, কিংবা কেউ কেউ নদী থেকে উচ্চ দামে পীচ সংগ্রহ করেন।

এই অবস্থায় আপনি যদি থাই পদ্ধতিতে ১.৫–২ মাস নার্সিং করে পীচ তৈরি করে ঘেরে ছাড়েন অথবা নার্সিংকৃত পীচ বিক্রি করেন, তাহলে ভালো মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


সুবিধাসমূহ

  1. মাত্র দেড়–দুই মাসে নার্সিং সম্পন্ন করা যায়।

  2. অল্প জায়গায়—বিশেষ করে ১০–১৫ শতকেও করা সম্ভব।

  3. তুলনামূলকভাবে কম পুঁজি লাগে।

  4. নার্সিংকৃত পীচের চাহিদা বেশি

  5. ভালো দাম পাওয়া যায়।

  6. বছরে একাধিকবার নার্সিং করা যায়।

  7. মৌসুমী পুকুর/রাস্তার পাশের মৌসুমী জলাশয়েও করা যায়।

  8. ঘেরে ছাড়ার পর পীচ দ্রুত বড় হয় এবং মৃত্যুহার কম থাকে।


থাই পদ্ধতিতে গলদা নার্সিং: ধাপে ধাপে চাষ পদ্ধতি

১) পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি

  • ১৫–৩০ শতকের ছোট পুকুর নার্সিং-এর জন্য উপযুক্ত।

  • পুকুরটি রৌদ্রআলোকিত ও খোলামেলা হলে ভালো।

  • সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে পুকুর সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিতে হয়।

  • মাটি রোদে ফেটে গেলে ট্রাক্টর দিয়ে আড়াআড়িভাবে ২–৩টি চাষ দিতে হবে।

  • পুকুরে গ্যাস তৈরি কমাতে তলদেশে অল্প বালি ছিটিয়ে এবং মই/অন্যান্যভাবে তলা সমান করে নিতে হবে।


২) চুন ও সার প্রয়োগ

  • প্রতি শতকে ১ কেজি পাথুরে চুন আগের দিন গুলে পরদিন পাড়সহ পুকুরে ছিটিয়ে দিন।

  • চুন দেওয়ার ৩ দিন পর প্রতি শতকে—

    • ৫ কেজি পচা গোবর অথবা

    • ৪ কেজি মুরগির বিষ্ঠা
      ছিটিয়ে ২–২.৫ ফুট পানি দিয়ে পুকুর ভরুন।

লবণাক্ততা সামান্য বাড়ানো (খুব গুরুত্বপূর্ণ):
অনেক গলদা খামারে নার্সিং পুকুরে সামান্য লবণাক্ত পানি যোগ করে লবণাক্ততা ২–৩ পিপিটি রাখা হয়। কারণ অনেক হ্যাচারিতে পি.এল. যে পানিতে থাকে, সেখানে লবণাক্ততা ১২ পিপিটির বেশি হতে পারে। তাই হঠাৎ একেবারে স্বাদু পানিতে ছাড়লে ধকল/শক বেড়ে মৃত্যুহার বাড়তে পারে—এ ঝুঁকি কমাতে নার্সারির পানির লবণাক্ততা সামান্য বাড়ানো হয়।

সাপ্তাহিক সার (প্রথম ৩ সপ্তাহ):

  • পানি দেওয়ার পর প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া + ২৫০ গ্রাম টিএসপি সপ্তাহে ১ বার।

  • পোনা মজুদের ৩ সপ্তাহ পর সাধারণত আর সার দেওয়া হয় না।


৩) আশ্রয়স্থল (Shelter) ব্যবস্থা

পি.এল. শুরুতে দ্রুত খোলস পরিবর্তন করে—তখন তারা দুর্বল থাকে এবং আশ্রয় খোঁজে। তাই প্রতি শতকে ১–২টি আধা শুকনো

  • নারকেল পাতা / খেজুর পাতা / তাল পাতা
    দেওয়া যেতে পারে।
    খেজুর পাতা হলে পাতার অগ্রভাগের সূঁচালো অংশ কেটে দিন।


৪) পি.এল. মজুদ (Stocking)

  • পানি ও সার দেওয়ার ৫–৬ দিন পর প্রতি শতকে ৪০০টি পি.এল. মজুদ করা যায়।

  • পি.এল. ছাড়ার আগে ধীরে ধীরে ঘের/পুকুরের পানির সাথে খাপ খাইয়ে (Acclimatization) ছাড়তে হবে, নইলে মৃত্যুহার বাড়তে পারে।

যারা মূল ঘের/পুকুরেই নার্সিং করতে চান:
পুকুর/ঘেরের এক-চতুর্থাংশ জায়গা পলিপ্রোপাইলিন/পলিথিন শিট দিয়ে ঘিরে নার্সারি পেন তৈরি করা যায়।


৫) খাদ্য ব্যবস্থাপনা

ক) ডিমের কাস্টার্ড (প্রথম ১৫ দিন)

রেসিপি:

  • ৬টি ডিম + ৩ টেবিল চামচ গুঁড়া দুধ ভালোভাবে ফেটে

  • বাষ্পে সিদ্ধ করে কাস্টার্ড বানান

  • তারের চালুনি দিয়ে ছোট ছোট টুকরো করে পুকুরে দিন

খাওয়ানোর নিয়ম:

  • দিন ১–৭: শুধু ডিমের কাস্টার্ড

  • দিন ৮–১৫: কাস্টার্ড + পিলেট (ধীরে ধীরে কাস্টার্ড কমিয়ে পিলেট বাড়াবেন)

  • দিন ১৬ থেকে: শুধু পিলেট

ডিমের কাস্টার্ড নার্সিং-এর জন্য পুষ্টিকর ও ভালো মানের খাবার। অনেক জায়গায় এটি ব্যবহার হয় না বা বানানোর পদ্ধতি জানা নেই—তাই ভালো ফল পেতে এই পদ্ধতি চালু করা জরুরি।


খ) পিলেট খাবার (১৫ দিনের পর)

আপনি বাজার থেকে পি.এল. উপযোগী স্টার্টার পিলেট কিনতে পারেন, অথবা বাড়িতেও তৈরি করতে পারেন।

ঘরে তৈরি পিলেট ফর্মুলা (প্রধান সূত্র):

  1. ফিশ মিল — ২৫%

  2. চিংড়ির গুঁড়ো / বোন অ্যান্ড মিট মিল — ১০%

  3. ব্লাড মিল — ৫%

  4. সরিষার খৈল — ২০%

  5. কুঁড়া — ১৫%

  6. ভূষি — ১০%

  7. ময়দা — ৫%

  8. চিটাগুড় — ৫%

  9. ঝিনুকের গুঁড়া — ২%

  10. লবণ — ১%

সহজ বিকল্প সূত্র (যদি প্রধান সূত্র সম্ভব না হয়):

  • ফিশ মিল ৩০%

  • খৈল ২৫%

  • কুঁড়া ২২%

  • ভূষি ২০%

  • ঝিনুকের গুঁড়া ২%

  • লবণ ১%

খৈল ভিজিয়ে মন্ড তৈরি (খুব কাজে দেয়):

  • খৈল ২.৫ গুণ পানি দিয়ে ১০–১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন

  • অন্য উপাদান মিশিয়ে খৈলের সাথে মন্ড বানান

  • হ্যান্ড/পাওয়ার গ্রাইন্ডার দিয়ে পিলেট বানান

  • প্রয়োজন অনুযায়ী ডাইস বদলে চিকন/মোটা পিলেট করুন

  • শুকিয়ে ব্যবহার করুন


৬) খাদ্য দেওয়ার সময়সূচি

প্রতিদিন অন্তত ৩ বেলা খাবার দিন—

  • সূর্যোদয়

  • সকাল ১০–১১টা

  • সূর্যাস্ত

চিংড়ি নিশাচর হওয়ায় দিনের মোট খাবারের ভাগ এমন হতে পারে—

  • সন্ধ্যায় ৫০%

  • ভোরে ৩০%

  • দুপুরে ২০%

সম্ভব হলে প্রতিদিনের খাবার প্রতিদিন তৈরি করুন। ফ্রিজ থাকলে কয়েক দিনের খাবার একসাথে তৈরি করা যায়।


৭) অন্যান্য পরিচর্যা

  • আশ্রয় হিসেবে ছিদ্রযুক্ত মাটির ভাঙা পাইপ বা কুমোরের কাছে বানানো ৩–৪ ফুট লম্বা ছিদ্রযুক্ত পাইপ ব্যবহার করা যায়।

  • প্রতি শতকে ২–৩টি আশ্রয় দিলে ভালো।

  • পানিতে অক্সিজেন সমস্যা যেন না হয়—সতর্ক নজর রাখুন। প্রয়োজনে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করুন।

  • যারা পেন পদ্ধতিতে নার্সিং করেন, দেড়–দুই মাস পর পেন তুলে দিলে পোনা/পীচ পুরো পুকুরে ছড়িয়ে পড়ে।

  • পেন তোলার আগে স্যাম্পলিং করে দেখুন—কতটি বেঁচে আছে, গড় ওজন/সাইজ কত।


৮) নার্সিংকৃত পীচ আহরণ ও ছাড়ার হার

দেড়–দুই মাস পর পি.এল. জুভেনাইল/পীচে রূপান্তরিত হয়। তখন—

  • পানি শুকিয়ে বা অন্যভাবে ধরে

  • মূল ঘেরে প্রতি শতকে ৮০–১০০টি করে ছাড়তে পারেন
    অথবা

  • অন্য চাষির কাছে উচ্চদামে বিক্রি করতে পারেন (প্রতি পীচ প্রায় ৫ টাকা, কখনও ৭–৮ টাকা পর্যন্ত)।

খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে দেড়–দুই মাস বয়সী নার্সিংকৃত বা নদী থেকে পাওয়া জুভেনাইলকে স্থানীয়ভাবে “পীচ” বলা হয়।


শেষ কথা

আগে অনেক জায়গায় পোষ্টলার্ভা (পি.এল.) সরাসরি ঘের/পুকুরে মজুদ করে বাজার উপযোগী করতে ৮–৯ মাস লেগে যেত এবং মৃত্যুহারও বেশি ছিল। কিন্তু নার্সিং করে দেড়–দুই মাস বয়সী পীচ ছাড়লে ৫–৬ মাসেই ফলন পাওয়া সম্ভব—এবং মৃত্যুহার তুলনামূলক কম

কাজেই যত দ্রুত আমরা নার্সিংকৃত পীচ ঘেরে ছাড়ব, তত দ্রুত এবং তুলনামূলক নিরাপদভাবে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব।

লেখক: কৃষিবিদ এ.কে.এম. রোকসানুল ইসলাম এবং কৃষিবিদ ফরিদা ইয়াসমিন, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সোনাডাঙ্গা, খুলনা।